এম ওবায়দুর রহমানের – দুঃখ সুখের মিডিয়া কথা

এম ওবায়দুর রহমানের ফেসবুক স্টাটাস থেকে নেয়া -দুঃখ সুখের মিডিয়া’র কথা

দুঃখ সুখের মিডিয়া (বেতার পর্ব) -৫
বন্ধুদের বেতারালাপ

পারিবারিক পরিমন্ডলের বাইরেও বেতার কেন্দ্রিক নানান অালাপ -অালোচনা ও ঘটনাপ্রবাহ অামার কিশোর মনের উপর ক্রমশ অারও বেশি করে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বিশেষ করে ক্লাস সেভেন -এইটে পড়ার সময় দুই সহপাঠী বন্ধু মাহবুব ও পরিতোষ ছিলো বেতার অন্তপ্রাণ শ্রোতা। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তাদের বেতার অনুষ্ঠানের ভালোমন্দ অালোচনা অামাকে অারও বেতার অনুরাগী করে তোলে। তখন সকাল সকাল রেডিও শোনার সুযোগ হতো না, কারণ ঐ সময়টায় অাব্বা বাড়িতে থাকতেন। একটু বেলা হলে তবেই তিনি বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তেন। কাজেই সকালের দিকে কিসব অনুষ্ঠান -অাসর প্রচার হতো সে সম্পর্কে অামি ওয়াকিবহাল ছিলাম না। ক্লাসে মাহবুব -পরিতোষের পাশে বসলে সে সবের অাপডেট জানতে পারতাম। অামি যেহেতু তখন পর্যন্ত ঐসব অনুষ্ঠানমালা শুনতাম না, তাই তাদের সাথে অালোচনায় অংশ নিতে পারতাম না। বরং মুগ্ধ হয়ে শুনতাম সকালবেলার অায়োজন -মহানগর, অাজকের ঢাকা, স্বনামখ্যাত উপস্থাপক কৌশিক অাহমেদ -এর অনবদ্য অনুস্থাপনাশৈলীর কথা। কোনো কোনোদিন একনাগাড়ে তাদের অালোচনা চলতো ঢাকা বেতারের প্রভাতি ম্যাগাজিন -দর্পন নিয়ে। দর্পনের সাময়িক প্রসঙ্গ, সাম্প্রতিকী, এইদিনে, গল্প নয় সত্যি এইসব নিয়ে চলতো তাদের জম্পেশ অালোচনা। মজার ব্যাপার হলো বেতারের সুকন্ঠ উপস্থাপক কৌশিক অাহমেদের নাম বন্ধুদের মুখে শুনলেও তাঁর উপস্থাপনা শোনার সৌভাগ্য কখনোই হয়নি। কারণ অত ভোরে পরবর্তী কয়েক বছর অামার রেডিও শোনার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। অার অামি যখন অারও অনেক পরে ১৯৯৫ সালে বেতার উপস্থাপক হই, তার বেশ ক’বছর অাগেভাগেই তিনি রেডিও ছেড়ে সূদুর অামেরিকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। অবশেষে তাঁর সঙ্গে পরিচয়টি হয়েছিলো বটে, তবে সেটা ধূলিমাটির বঙ্গভূমি বা মার্কিন মুল্লুকে নয় -সাইবার জগতে ফেসবুকের কল্যাণে ২০১১ সালে। সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি হলো, বেতারে অডিশনে পাস করে অামার প্রথম তালিকাভুক্তি ম্যাগাজিন -দর্পনে পান্ডুলিপি পাঠক হিসাবে।

দুঃখ সুখের মিডিয়া (বেতার পর্ব) -৬
ও ভাই অাশেকের দিওয়ানা

অারও দুটি -একটি ঘটনার অবতারণা না করলে অামার শৈশব -কৈশোরের বেতার প্রীতি ও বেতার স্মৃতির অনেকখানিই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
এ সময়টিতে অামাদের বাড়ির উত্তর পাশে অাব্বার চাচার বাড়িতে পুরনো রেডিও সেটের পরিবর্তে অাসে খোদ জাপানি প্যানাসনিক ব্র্যান্ডের ইয়াবড় এক টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট প্লেয়ার কাম ট্রানজিস্টার। সে এক দেখার জিনিসই বটে! একের ভিতরে তিন যাকে বলে!
এই প্রথম ফজলু নানার কল্যাণে এত সুন্দর একটা চকচকে নতুন টেপ রেকর্ডার ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হলো। কিছুদিন তো রেডিও কিংবা টেপ শোনার চেয়ে ঘুরেফিরে চারপাশটা দেখার ঘোরই কাটেনি!
অাব্বার চাচা হাজী ইসমাইল ওরফে তামসা অজী অনেককাল নিঃসন্তান ছিলেন। অামার প্রথম দাদীজান মারা গেলে পরে অনেকটা বৃদ্ধবয়সে এলাকার মুরুব্বীজনদের পীড়াপীড়িতে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন তিনি। ঐ তরফে পিঠাপিঠি অামার তিন চাচা ও ফুফু জন্ম নেন -যারা সবাই বয়সে অামার ছোট। অতীব দুঃখের বিষয়, অামার দাদাজান ছোট্ট তিনটি শিশুসন্তান ও বিশাল ধনসম্পত্তি রেখে হঠাৎ পরপারে চলে যান। কয়েক বছর যেতে না যেতেই অামার দাদীজানও রোগে ভোগে একই পথের পথিক হন। ঘটনার অাকস্মিকতায় অামার অাব্বা, পাড়া -পড়শি এমনকি গোটা এলাকার লোকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন এতিম বাচ্চাদের অভিভাবকত্ব ও অনাগত ভবিষ্যৎ চিন্তায়। একরাতে বিশাল দরবার বসে চেয়ারম্যান -মেম্বার, পাড়াপড়শি, অাত্মীয় -পরিজন ও গ্রামবাসীদের নিয়ে। সেই দরবারের অামিও ছিলাম ক্ষুদে শ্রোতা। মনে অাছে লম্বা তর্কবিতর্ক শেষে সিদ্ধান্ত হয় -অামার অাব্বারই তার এতিম তিন চাচাতো ভাইবোনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। দরবারের অমন অাকস্মিক সিদ্ধান্তে অাব্বা যেন মহাবিপাকে পড়ে গেলেন। তিনি বললেন -‘অামি তো অামার তিন ছেরাছেরির দায়িত্ব নিয়াই হিমশিম খাই, তার উপরে অারেকটা বড়সড় ফ্যামেলির দায়িত্ব নেই ক্যামনে? ‘তখন অবশ্য অামরা তিন ভাইবোনই ছিলাম। অামি, অাশেক ও খনা। মেট্রিক পাশ করে ঢাকায় অাসার বছর দিন পর অামার সবছোট ভাই হিমেলের জন্ম হয়।
যাক সবাই খুব জোরাজোরি করে ধরলো অাব্বাকেই এ গুরুদায়িত্ব নিতে হবে -অার কারও পক্ষে এটি সম্ভব নয়। অাব্বার এক কথা -অামার পক্ষে সম্ভব না। অনেক রাত অবধি হ্যাঁ -না’তে এই টানাটানি চললো। শেষমেশ অাব্বাই প্রস্তাব করলেন -‘চাচা মারা যাওয়ার পর দেখসি, ফজলু মামু(অামার এতিম চাচা -ফুফুদের মেজো মামা) অাইয়া এই ফ্যামেলির অনেক দায়দায়িত্ব পালন করসে -অামার মনে অয় হেইলারে দায়িত্ব দেওয়া ঠিক অইবো। ‘
অাব্বার চিরকালই একটা স্বভাব দেখেছি -তিনি যা বলেন তা তিনি করে ছাড়েন। সে রাতের শালিসি দরবারেও তিনি মনপ্রাণে চেয়েছিলেন তাঁর এতিম ভাইবোনের দায়দায়িত্ব যেন ওদের মামা -মামিকে দেওয়া হয়। বাড়ির শরিকদের কারও কারও ঘোরতর অাপত্তি থাকলেও শেষমেশ সবাই অাব্বার প্রস্তাবটিই মেনে নিয়েছিলেন। অামার এই ফজলু নানাই পরে একসময় এলাকার ছোটবড় সবার ফজলু মামু হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। নানার ছিলো নানান চমক দেখানোর বাতিক! অামার চাচাদের ফ্যামেলিতে অাসার কিছুদিন পরই তাঁর প্রথম চমকটি ছিলো ঐ টেপ -রেকর্ডার কাম ট্রানজিস্টার, যাতে রেডিওর পাশাপাশি বেশিরভাগ সময়ই বাজতো ওয়ায়েস কুরনীর জারিগান। তখনকার জনপ্রিয় সেই গাতক নবীপ্রেমে ব্যাকুল হয়ে ক ‘লাইন পরপরই অার্দ্র কন্ঠে গেয়ে উঠতেন –
‘ও ভাই অাশেকের দিওয়ানা
অাশেক ছাড়া এই দুনিয়ায় মাশেক মিলবে না। ‘

দুঃখ সুখের মিডিয়া (বেতার পর্ব) -৭
ছাগলগীতি -মেরাগীতি!!

অাগের পর্বে অামার ফজলু নানার সাথে অাপনাদের পরিচয় হয়েছে। নানা ছিলেন খুব রসিক মানুষ -নানীও কম না। তারা বেশ বুঝে গেছেন তাদের এই অালাভোলা নাতিটা সত্যিকারের রেডিও পাগলু! তাই সময় সময় অামাকে নিয়ে মজা করতে ছাড়তেন না! অামি তড়িঘড়ি পড়াশোনা শেষ করে প্রতি রাতে অাব্বা অাসার অাগে অাগে টানা ঘন্টা দেড়েক নানার বড় সেটে মজা করে রেডিও শুনে অাসতাম। সত্যি বলতে কি -তখন ছোটখাটো সেটে রেডিও শুনতেই চাইতাম না। স্পষ্ট অার গমগমে অাওয়াজ কি যেন একটা অাবেশে ছেয়ে ফেলতো অামায় -নতুন এক জাদুর বাক্স যেন!
ওদিকে নানার ওয়ায়েস কুরনী জারিগানের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের এ পাড়া ও পাড়া থেকে মুরুব্বী দাদী -জেঠীরা নানাকে খুব করে ধরতো সন্ধ্যের পর টেপটা নিয়ে যাওয়ার জন্য। মনে অাছে বেশ ক ‘জায়গায় অামিও সুযোগ বুঝে উনার সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। সেকি করুণ -মর্মন্তুদ দৃশ্য, চোখে না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না! জারির সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী জায়গাটি ছিলো -নবীজির দন্ত মোবারক শহীদ হবার খবর যখন হযরত ওয়ায়েস কুরনীর কাছে পৌঁছুল তখন তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে একে একে তাঁর বত্রিশটি দাঁত নিজহাতে উপড়ে ফেললেন। এই করুণ মূহুর্তটির বর্ণনার সময় বয়াতির কণ্ঠ ছাপিয়ে সেটের চারপাশ থেকে মুরুব্বীদের চাপাকান্না অার অাহাজারি ভেসে অাসতো! এমন হৃদয় -বিদারক পরিবেশে অামিও কোনক্রমেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারতাম না।
একদিন হলো কি -রাতের পড়া শেষ করে রেডিও শুনতে গিয়ে দেখি নানা -নানি অায়েশ করে পান খাচ্ছেন অার রেডিওর অনুষ্ঠান শুনছেন। অামায় দেখেই নানা বলে উঠলেন -‘অারে তর নানির লগে তর কতাঐ কইতাসিলাম। জানস, কালহা রাইত তুই যাওয়ার পরে পরেই শুরু অইসে ছাগলগীতি -যারে বলে গান! পল্লীগীতি, লালনগীতি, নজরুলগীতি -এইগুলি কুনু গান অইলো? অাসল গান অইলো ছাগলগীতি -বাপরে বাপ, গান কারে কয়! ‘এটা বলেই তিনি নানির দিকে তাকাতেই নানি মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বললেন, ‘তর নানা ঠিকঐ কইসে! তুই তো তর অাব্বার ডরে গেলেগা -হুনলে তর জীবনডা ধইন্য অইয়া যাইতো! ‘নানি নানার দিকে তাকিয়ে অারও বললেন ‘কিগো, উবায়দুরডে মেরাগীতির(অামাদের এলাকায় ভেড়াকে মেরা বলে) কতা তো কইলাইন না -এর অাগের রাইত যে প্রচার অইলো? ‘
শোনামাত্রই অামার চিন্তাজগতে তোলপাড়! নানা -নানি কয় কি? কত কত গান শুনলাম -পল্লীগীতি, লালনগীতি, নজরুলগীতি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী, মারফতি অারও কত কি, কিন্তু ছাগলগীতি -মেরাগীতি তো জীবনেও শুনলাম না! অাবার ভাবি হতেও পারে -নানা নানি তো না শুনে বলেননি? অার অামিও তো অত রাতে রেডিও শুনি না -জানবো কেমন করে? যাক তারপর ছাগলগীতি -মেরাগীতির কথা কাউকে বলি না বটে, তবে মনে মনে অপেক্ষা করে থাকি সেই মজার গানগুলো একটিবার শোনার জন্য!!

দুঃখ সুখের মিডিয়া (বেতার পর্ব) -৮
সংবাদ পাঠকরাই জ্ঞানী -শ্রেষ্ঠ!
সেই ছোটবেলা থেকে রেডিও শুনতে শুনতে একটি বিষয় অামার কিশোর -মনে বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, বেতারে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে সংবাদ পাঠকই জ্ঞানী -শ্রেষ্ঠ! নইলে দেশ -দুনিয়ার সকল খবরাখবর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে বলে দেয় কেমন করে? তখন যারা খবর পড়তেন বিশেষ করে ইমরুল চৌধুরী, ওয়াকার খান, অাবুল কালাম অাজাদ, রোকেয়া হায়দার, সিরাজুল মজিদ মামুন এবং পরের দিকে অাসমা অাহমেদ মাসুদ, রেহানা পারভীন -এদের সবাইকে অামার বিস্ময় মানব -মানবী বলে মনে হতো! খবরের সময় হওয়ার অাগেভাগেই গান কিংবা যন্ত্রসঙ্গীতকে প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া হতো, কর্তব্যরত ঘোষক তার দরাজ কন্ঠের ঘোষণায় বলতেন -একটু পরেই খবর শুনতে পাবেন -অার সাথে সাথেই বেশকটি বিপ দিয়ে একটা ভারিক্কি চালে শুরু হয়ে যেত,,, দুপুর ১২টা, খবর পড়ছি অামি…
লক্ষ্য করতাম একমাত্র খবর শুরু হলেই গ্রামে কিংবা বাজারের দোকানে সমবেত লোকেরা মুহূর্তের মধ্যে চুপ মেরে উৎকর্ণ হয়ে খবর শুনতেন। উপস্থিত লোকদের থেকেই কেউ হয়তো উচ্চস্বরে বলে উঠতেন -এ্যায় সাউন্ডটা ইকটু বাড়ায়া দেও -দেহি কি কয়? ‘ মূলত এসব কারণেই দিনে দিনে খবরের মাহাত্ম্য অামার কাছে বড় হয়ে উঠে। মনে মনে ভাবতে থাকি-‘যদি কুনুদিন রেডুত যাইতারি, তাইলে খবরঐ পড়াম! ‘
১৯৮৫ সালের কথা। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায়। অাব্বার অনেক ইচ্ছে অামাকে ডাক্তার বানানোর। তাই ধরে নিয়েছিলাম ইন্টারমিডিয়েট ঢাকাতেই পড়তে যাচ্ছি! অাব্বার ভাবনা যা -ই হোক না কেন, অামার ভেতরকার সুপ্ত বাসনা শুধুই খবর পাঠক হওয়ার! তাই কাউকে কিছু না বলে তাই নিজের সাথেই শলাপরামর্শ করি -”যাই না একবার ঢাহা, তারপরে যা অওয়ার হেইডা অামিই অইয়াম! ডাক্তর অইয়া কার ঠ্যাহা লাগসে মাইনষের গতর অার গু -মুত অাতাইতো! ‘চলবে..

9 comments

  1. Good day! I know this is kinda off topic however I’d figured I’d ask.
    Would you be interested in trading links or maybe
    guest authoring a blog article or vice-versa? My website goes
    over a lot of the same subjects as yours and I believe we could greatly benefit from
    each other. If you happen to be interested feel free to send me an e-mail.
    I look forward to hearing from you! Great blog by the way!

  2. Wonderful beat ! I wish to apprentice as you amend your website,
    how can i subscribe for the blog internet site? The account aided me
    a acceptable deal. I was tiny bit acquainted of this
    your broadcast offered bright clear concept

  3. Wonderful blog! I found it while surfing around on Yahoo News.
    Do you have any tips on the way to get listed in Yahoo News?
    I’ve been trying for a while having said that i never seem to arrive!
    Appreciate it

  4. I like everything you guys are often up too. This kind of clever work and exposure!
    Keep up the excellent works guys I’ve included you guys to my blogroll.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *